ইতিহাস গড়লেন সেলীনা : রোটারিতে নারী নেতৃত্বের সূচনা

প্রকাশিত: ৩:২৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২৫

ইতিহাস গড়লেন সেলীনা : রোটারিতে নারী নেতৃত্বের সূচনা

সুবর্ণা হামিদ : তিন যুগের পুরুষতান্ত্রিক একচেটিয়তা শেষ করে, এক সাহসী নারীর নাম এখন ইতিহাসের পাতায় গর্বের জায়গায় লেখা—সেলীনা আক্তার চৌধুরী। সিলেট মিডটাউন রোটারি ক্লাবের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট হিসেবে তার জয় শুধুই একটি চেয়ার দখলের গল্প নয়, এটি এক সময়ের, এক মানসিক বিপ্লবের, এক সাহসী উত্তরণের গল্প। তিনিই এখন এক পরিবর্তনের মুখ, এক প্রেরণার প্রতীক।

একটি ইতিহাসের শুরু

রোটারি ক্লাব অব সিলেট মিডটাউন—৩৭ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে কখনো কোনো নারী নেতৃত্বে আসেননি। সেই ধারায় প্রথমবারের মতো পরিবর্তনের সুর এনেছেন সেলীনা আক্তার চৌধুরী। তিনি ২০২৫-২৬ রোটাবর্ষের জন্য প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট নির্বাচিত হয়ে, ক্লাবের নেতৃত্বে প্রথম নারী হিসেবে নাম লেখালেন। তবে তার এই অর্জন শুধুমাত্র ক্লাবের জন্য নয়—এটি একটি সমাজ, একটি সময়, এবং এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে।

নেতৃত্বের পথে নিঃশব্দ অগ্রযাত্রা

২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর তিনি রোটারি ক্লাব অব সিলেট মিডটাউনের সদস্যপদ গ্রহণ করেন। তখন থেকেই সেবার অঙ্গীকার ও মানবিক চেতনায় বলিয়ান হয়ে ক্লাবের কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু করেন। মাঠপর্যায়ের কাজ থেকে শুরু করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে ছিল তার নিরলস কাজ আর সাহসিক উপস্থিতি।

তিনি প্রমাণ করেছেন—নেতৃত্ব শুধু নির্দেশ নয়, তা হল কাজ, সংযোগ, দায়বদ্ধতা এবং মানবিকতা।

শিকড় থেকে শিখরে

সিলেটের সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গণিপুর গ্রামে জন্ম সেলীনা আক্তার চৌধুরীর। এক অভিজাত ও শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নারী শৈশব থেকেই ছিলেন নেতৃত্বগুণে আলাদা। পিতা মরহুম আব্দুল মোক্তাদীর চৌধুরী ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, আর মাতা আমেনা বেগম একজন দৃঢ়চিত্ত, মমতাময়ী মা।

জীবনের পথে অনেক চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে, তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক মানবিক ও দায়িত্বশীল নারী নেতৃত্ব হিসেবে।

সংসার, সমাজ ও সেবার দুর্দান্ত সমন্বয়

সেলীনা আক্তার চৌধুরী কেবল একজন রোটারিয়ান নন, তিনি একজন প্রযোজক (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন), একজন প্রকাশক (অনলাইন পোর্টাল “সিলেট ভয়েস”), একজন ব্যবসায়ী, এবং সমাজসেবী। তিনি লাইফ মেম্বার জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন, সদস্য সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, এবং উপদেষ্টা সিলেট উইমেন্স জার্নালিস্ট ক্লাবের।

পারিবারিকভাবে যুক্ত আছেন আমদানী-রপ্তানী ব্যবসার সাথে। ব্যক্তিজীবনে তিন সন্তানের জননী সেলীনা, যাদের প্রতিপালনেও তিনি দেখিয়েছেন দায়িত্ববোধ, শিক্ষা ও আদর্শের নজির।

ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি

সেলীনা আক্তার জানান, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মূল লক্ষ্য থাকবে—নারী শিক্ষা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং তরুণদের কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়ন। তার নেতৃত্বে ক্লাবের কার্যক্রম নতুন মাত্রায় প্রবেশ করবে, যেখানে নারীর কণ্ঠস্বর শোনা যাবে নেতৃত্বের কেন্দ্রে এবং তারা হবেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্রিয় অংশ।

তার ভাষায়,
“এটা শুধু আমার অর্জন নয়, এটা বহু নারীর স্বপ্নের প্রতিফলন। আমি চাই—আমার নেতৃত্ব আরও নারীর জন্য পথ খুলে দিক।”

এক অনুপ্রেরণার নাম

সেলীনা আক্তার চৌধুরী এখন কেবল একজন প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট নন, তিনি রোটারিয়ান নারীদের নতুন যুগের দরজা খুলে দিয়েছেন। তার নেতৃত্ব শুধু একটি পদ নয়, এটি একটি বার্তা—নারী শুধুই ফলোয়ার নয়, নেতৃত্বের সমান অংশীদার।

সিলেট মিডটাউন রোটারি ক্লাবের সদস্যরা আশাবাদী, তার অভিজ্ঞতা ও দায়বদ্ধতা ক্লাবকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।

শেষ কথা:
সেলীনা আক্তার চৌধুরীর এই পদার্পণ এক নবজাগরণের সূচনা। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে সাহসী পরিবর্তনের দূত হিসেবে। আজ তিনি নিজেই একটি সময়, একটি পথ, একটি অনুপ্রেরণা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ