সিলেটে রাস্তাজুড়ে অবৈধ যানবাহনের রাজত্ব, অভিযান পিছিয়ে গেলো হরতালের কারণে

প্রকাশিত: ৭:১৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২৫

সিলেটে রাস্তাজুড়ে অবৈধ যানবাহনের রাজত্ব, অভিযান পিছিয়ে গেলো হরতালের কারণে

সিলেটের সড়কজুড়ে যেন অবৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের রাজত্ব। প্রায় আড়াই হাজার পুরোনো বাস-ট্রাক এবং অর্ধলক্ষাধিক রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা অবাধে চলাচল করছে নগরের প্রধান রাস্তায়। প্রশাসনের একাংশের দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এসব অনিয়ম দিনের পর দিন চলে এলেও ট্রাফিক বিভাগের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এতদিন দেখা যায়নি।  এই চিত্র বদলাত অভিযান শুরু করার কথা ছিলো রোবার থেকে  কিন্তু তা হচ্ছে না ঘোষিত হরতালের কারনে।  অভিযানের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন  এসএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।

অবৈধ যান, অদৃশ্য ‘স্টিকার’ আর চাঁদাবাজি
সিলেটের চলাচলরত যানবাহনের প্রায় অর্ধেকই অনুমোদনহীন। চালকদের দাবি, ‘স্টিকার’ নামক একটি অদৃশ্য অনুমতিপত্রের মাধ্যমে এসব যান এক মাস পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চলে। আগে যেখানে গাড়িতে ‘টোকেন’ ঝুলিয়ে চলা হতো, এখন মোবাইল ফোনের পেছনে বসানো হয় এই স্টিকার। প্রতিমাসে এর জন্য আদায় করা হয় ১,৩০০ থেকে ১,৫০০ টাকা।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই ‘স্টিকার সিন্ডিকেটেও’ এসেছে বড় পরিবর্তন। আগের আওয়ামীপন্থী নেতাদের সরিয়ে এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁদের প্রতিপক্ষরা। টোকেনের দামও বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচগুণের বেশি ৩০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকায়।

পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট বিশৃঙ্খলা
বিআরটিএ সূত্র জানায়, সিলেটে বৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ১৯,২০০টি। অথচ বাস্তবে চলাচল করছে প্রায় ৫০,০০০ এর বেশি। অনুমোদন ছাড়াই রাস্তায় নামা ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ৬০,০০০। এসব যানবাহন শহরের বাইপাস, শেখঘাট, আম্বরখানা, দক্ষিণ সুরমা ও তামাবিল রোডে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া চলমান লেগুনার প্রায় ৯৮ শতাংশেরই বৈধ কাগজপত্র নেই।
সিলেটে মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৭টি। এর মধ্যে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি শুধু মোটরসাইকেল। বাস মাত্র ৬টি, মিনিবাস ৬৭৩টি, ট্রাক ১১৯৩টি, প্রাইভেটকার ৪৮৯০টি এবং হিউম্যান হলার ৪৫২৯টি। লক্ষাধিক প্যাডেল রিকশা থাকলেও এর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সিটি করপোরেশনের কাছেও নেই।
চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারে শ্রমিক কমিটির আধিপত্য
সিলেটে রয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ১৮৩টি শ্রমিক কমিটি। এর মধ্যে ৩০টির বেশি রয়েছে মহানগর এলাকায়। এসব কমিটিতে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার, যাঁদের বেশির ভাগই চালক। নেতা আছেন প্রায় দুই হাজার। ফলে এসব কমিটির প্রভাব, চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা যথেষ্ট বেশি।
সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নতুন এলাকা
সিলেট সিটি করপোরেশনের পুরোনো আয়তন ছিল ২৬.৫০ বর্গকিলোমিটার, যা সম্প্রসারিত হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ বর্গকিলোমিটারে। তবে সম্প্রসারিত অনেক এলাকাই এখনও কার্যত প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, যেখানেই অবৈধ যানবাহনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

প্রশাসন ও মালিকদের বক্তব্য
পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিরুজ্জামান বলেন, ‘যে কোনো বৈধ ব্যবসার জন্য অবৈধ পরিবহন বিষফোড়ার মতো। আমরা বরং চাই রাস্তাগুলো অবৈধ যানমুক্ত হোক।’ তিনি আরও জানান, বর্তমানে প্রায় ২২০০ মেয়াদোত্তীর্ণ বাস-ট্রাকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে হঠাৎ বন্ধ না করে সময় চেয়ে আবেদন করেছে মালিকরা।
এসএমপির ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘পরিবহন খাতে যেসব অনিয়ম ও চাঁদাবাজি চলছে, তার সঙ্গে ট্রাফিক বিভাগের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’ তাঁর মতে, নগর পরিবহন ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবই মূল সমস্যার শিকড়।
তিনি আরও জানান, সিলেটে প্রায় ১,১০০ বাস ও ১,২০০ ট্রাকের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের বেশি। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী এসব যানবাহনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মালিকদের আশঙ্কা, এসব গাড়ি বন্ধ হলে নগরের পরিবহন ব্যবস্থা হঠাৎ ভেঙে পড়তে পারে।

এসএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ‘ হরতালের ঘোষণা এসেছে, এমন পরিস্থিতিতে সড়কে অভিযান চালানো সম্ভব নয়। ফলে আপাতত অভিযান স্থগিত রাখা হয়েছে।’ কবে নাগাদ অভিযান শুরু হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অভিযানের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।’

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ