শফিক আহমদ-পিয়ার : বাউল খোয়াজ মিয়া বাংলা মরমী সাহিত্যের এক নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ কবি ও সাধক, যিনি বাউল গান ও সুফিবাদের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে শত শত আধ্যাত্মিক গান রচনা করেছেন। তাঁর গানে মানবতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, আত্মা-অন্বেষণ, প্রেম ও ভক্তিমূলক চেতনার প্রগাঢ় প্রকাশ পাওয়া যায়। তিনি কেবল গীতিকার নন তিনি একজন আধ্যাত্মিক সাধক, যাঁর জীবন হলো গানের মাধ্যমে অন্তর্জগতে পথ চলার এক অনন্য অভিযাত্রা। জন্ম ও শৈশব:- বাউল খোয়াজ মিয়ার জন্ম ১৯৪২ সালের ১২ মার্চ, সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তিনি গানে গানে তাঁর পরিচয় ফুটিয়ে তুলেছেন ঠিক এভাবে— দৌলতপুর ইউ পি, পোস্ট অফিস ঠিকানাতে লেখি ঐ গেরামে জন্ম আমার, ঐ গেরামে থাকি।। তিনি তাঁর আরেক গানে লিখেন— সিলেটে জিলায় বসতবাড়ী, খোয়াজ মিয়া নাম থানা বিশ্বনাথ, দৌলতপুর ইউনিয়ন ও গ্রাম।। খোয়াজ মিয়ার পিতা মৌলভী আজিজুর রহমান এবং মাতা আছতুরা বিবি। শৈশবে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হলেও গানের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ তাঁকে বিদ্যাচর্চা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তিনি ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শৈশবে খুব ভালো বাঁশি বাজাতেন তিনি। বিবাহ ও সন্তানসন্ততি:- ১৯৬৭ সালে ২৫ বছর বয়সে প্রথম বিয়ের পিঁড়িতে বসেন শাহ মো. খোয়াজ মিয়া। পার্শ্ববর্তী হাসনাজী গ্রামের হাজী মো. আব্দুল জব্বারের কন্যা আঙ্গুরা বেগমের সাথে পারিবারিক ভাবেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বছর দু’য়েক পরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সংসার বিমুখ হয়ে পড়েন আঙ্গুরা বিবি। ততদিনে জালাল উদ্দিন নামে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন খোয়াজ মিয়া দম্পতি। সন্তান লালন পালনের শাররিক ও মানসিক সক্ষমতা হারালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। শিশু পুত্র জালাল উদ্দিনের দেখভাল করার নিমিত্তে পিতামাতার নির্দেশে ১৯৭২ সালে ওসমানী নগর উপজেলার চন্ডিতর গ্রামের ইয়াকুব আলী শাহ এর কন্যা শাহেদা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ২য় স্ত্রী শাহেদা বেগমকে সবাই আদরকরে ‘ছোটবি’ বলে ডাকতেন। এই তরফে তাঁদের ৫ সন্তান জন্ম নেয়। তারা হলেন যথাক্রমে– আলাল উদ্দিন, হেলাল উদ্দিন, দুলাল উদ্দিন, সুরমা বেগম ও আকলিমা বেগম। দাম্পত্য জীবন বেশ সুখেই চলছিল কিন্তু বিধি বাম। ১৯৮৫ সালে এক দূরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয় জীবনের মায়া ত্যাগ করেন সকলের ছোট বিবি শাহেদা বেগম। ৬ সন্তান নিয়ে বড় বিপাকে পড়েন খোয়াজ মিয়া। তিনি লিখেন– “মায়ে বাপে আদর করিয়া, আমারে করাইলা বিয়া সংসারের ভার আমায় দিয়া, বাবায় কইলা বাঁচিলাম। কেনে আমি বিয়া করিলাম।। তিনি তাঁর আরেক গানে লিখেন– “স্ত্রী-পুত্রের মোহ সদা, বিনা সূথায় আছি বাঁধা সাজিয়া ধোপারই গাধা, এ ধার ও ধার ঘুরিতেছি। আসিয়া সংসারও মাঝে, বিষম ধাঁধায় পড়িয়াছি।। একদিকে সংসারের গ্লানি অন্য দিকে সন্তানদের মানুষ করার তাগাদা। পরবর্তীতে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ১৯৮৬ সালে বিশ্বনাথ পৌরসভার মীরেরচর গ্রামের তৈয়ব আলীর কন্যা মোছা. ফাতেমা বেগমকে আত্মীয় স্বজনের পরামর্শের ভিত্তিতে ৩য় বিয়ে করেন মো. খোয়াজ মিয়া। এই তরফে তিনি তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। তাঁর সন্তানেরা হলেন রেদুয়ান আহমদ পাবেল, নাছিমা বেগম, মজুমা বেগম ও লিমা বেগম। ১০ সন্তানেরর জনক খোয়াজ মিয়া তাঁর গানে লিখেন– “বছর বছর ছয়টা মাইয়া/জন্ম নিছে বুর-বুরাইয়া/মাথাটা গেছে ঘুরিয়া-কি খাওয়াইয়া বাঁচাইতাম। কেনে আমি বিয়া করিলাম।। সেই থেকে অদ্যাবধি এই ফাতেমা বেগম-ই খোয়াজ মিয়ার সংসারের হাল ধরেছেন পরম মমতায়। দশ সন্তানকেই মায়ের আদরে বুকের মাঝে আগলে রেখেছেন ফাতেমা। গুরুদীক্ষা:- তখন তাঁর বয়স ২২ বছর। একদিন একই গ্রামের লতিফ আলী মাওলানার লাকড়ির ঘরে পরিত্যাক্ত অবস্থায় একটি দোতারা দেখতে পান খোয়াজ মিয়া। সেই দোতারা নিয়ে গান গাওয়া শুরু করেন। লতিফ আলী মাওলানা গানের প্রতি তাঁর এই টান দেখে তাঁকে দূর্বিন শাহ এর কাছে তালিম নেয়ার পরামর্শ দেন। কেননা গান হচ্ছে গুরু দীক্ষায় দীক্ষিত শিক্ষা। লতিফ আলী মাওলানার কথামত আধ্যাত্মিক পথচলার গুরু হিসেবে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায় জন্ম নেওয়া প্রখ্যাত মরমী সাধক ‘জ্ঞানের সাগর’ দূর্বিন শাহকে গ্রহণ করেন খোয়াজ মিয়া। তিনি ‘দূর্বিন টিলায়’ গিয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং একাধারে চার বছর পরিবারের কারো সাথে কোন রকম যোগাযোগ ছাড়াই গানের তালিম নেন। খোয়াজ মিয়ার মা আছতুরা বিবি শাররিক ভাবে খুব অসুস্থ্য হলে তাঁকে ‘দূর্বিন টিলায়’ গিয়ে খবর দেন লতিফ আলী মাওলানার ছোট ছেলে সাখাওয়াত। পরবর্তিতে তিনি গুরু দূর্বিন শাহ’র অনুমতিক্রমে বাড়ী ফিরেন এবং গান রচনায় ধ্যানমগ্ন হন। তিনি তাঁর গানে লিখেন– “দীক্ষা নিলে শিক্ষা মিলে, আমি যাব সেই স্কুলে কয় অধীন খোয়াজ পাগলে- যেথায় আল্লাহ-রাসূল পাওয়া যায়… মুর্শিদ ভজন:- খোয়াজ মিয়ার বয়স তখন ৩০ বছর। রক্ত আমাশয় রোগে আক্রান্ত হয়ে মাস দেড়েক শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। অসুস্থতা কেবল দীর্ঘতর হচ্ছিল। হঠাৎ একরাত্রে স্বপ্নে দেখেন কেউ একজন তাঁকে বলছে, “খোয়াজ, তুমি দ্রুত ছাবাল শাহ এর কাছে মুরিদ হও।” সাথে সাথে ঘুম ভাঙ্গলে খুব অস্তিরতা অনুভব করেন তিনি। পরের দিন খুব ভোরে উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের ‘ভিন্নারটেক’ নামক গ্রামে চলে যান খোয়াজ মিয়া। এবং ঐ দিন-ই তিনি সাধক ফকির ‘ছাবাল শাহ’ এর বায়াত গ্রহণ করেন। মুর্শিদের তত্ত্ব ও সাধনা তাঁর গানে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। মুর্শিদের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি লিখেন— “কামিল মুর্শিদ সাত রাজার ধন ভজলে মিলে পরশ রতন করলে সাধন হয় মহাজন চৌদ্দ পুরুষ স্বর্গে যায়।। খোয়াজ মিয়া আরো লিখেছেন– খোদাকে চিনিতে হলে, আগে চেনো আপনারে চিনবে যদি আগে চলো, পীর মুর্শিদের ধারে।। গান ও সাহিত্যকর্ম:- খোয়াজ মিয়ার পাঁচ শতাধিক গানের পান্ডুলিপি থাকলেও তিনি গান রচনা করেছেন সহস্রাধিক। আধ্যাত্মিক, বাউল, দেহতত্ব, দেশাত্ববোধক, মরমী এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য গান রচনা করেছেন। তাঁর গানে কেবল ইসলামি ভাববাদ নয়, বরং নানা ধর্ম ও শাস্ত্রীয় জ্ঞানের মেলবন্ধন পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য গানগুলোর