শেষ ঠিকানার ফেরিওয়ালা: মনছুর আহমেদের হাতে চার হাজার শেষ যাত্রার গল্প

প্রকাশিত: ২:০৪ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০২৫

শেষ ঠিকানার ফেরিওয়ালা: মনছুর আহমেদের হাতে চার হাজার শেষ যাত্রার গল্প

মহসিন রনিঃ তিনি আসেন চুপিচুপি, হাতে কোদাল—শেষ ঠিকানার প্রস্তুতি নিতে। মৃত্যুর খবর শুনলেই যেখানে শোকের ছায়া নেমে আসে, সেখানে এক মানবিক সৈনিক ছুটে আসেন নিঃশব্দে, নিঃস্বার্থে। তিনি মনছুর আহমেদ—সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরসভার কসবা গ্রামের এক অসাধারণ মানুষ।

প্রায় ১৫ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে কবর খননের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। মসজিদের মাইকে মৃত্যুর ঘোষণা হোক কিংবা পাড়া-মহল্লার গাড়ির মাইকে—খবর পেলেই ছুটে যান তিনি। আজ পর্যন্ত চার হাজারের বেশি কবর খনন করেছেন নিজের হাতে। যাতায়াতের খরচ থেকে শুরু করে কাজের যাবতীয় দায়ভারও তিনি বহন করেন নিজের পকেট থেকেই।

ছাত্রজীবনে, নবম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় এক প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল কবর খননের, তখন থেকেই এই কাজটির প্রতি জন্ম নেয় এক অদ্ভুত টান। যা সময়ের সাথে রূপ নিয়েছে শখ থেকে নেশায়, আর এখন তা পরিণত হয়েছে এক মানবিক দায়বদ্ধতায়।

তবে শুধু নিজেই থেমে থাকেননি মনছুর। “শেষ ঠিকানায় আমরা” নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন, যেখানে তরুণ ও প্রবীণ অনেকেই যুক্ত হয়েছেন তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে। এই সংগঠনের মাধ্যমে এলাকাজুড়ে মৃত্যুবরণকারীদের কবর খননের কাজ হচ্ছে সমন্বিতভাবে, সম্মানের সাথে।

মনছুর আহমেদ বলেন,
“২০১৩ সালের দিক থেকে নিয়মিতভাবে কবর খননে যুক্ত হই। তখন আমাদের অনেক সময় যাতায়াতের খরচও থাকত না। তবুও আমরা চেষ্টা করেছি মানুষের পাশে দাঁড়াতে। দোয়া করবেন, যতদিন বেঁচে আছি, এই কাজটা যেন করে যেতে পারি।”

সাধারণ জীবনে মনছুর একজন ব্যবসায়ী হলেও হৃদয়ের ভেতরে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক। মৃত্যুর পর মানুষের শেষ সঙ্গী হয়ে ওঠা—এ যেন এক নীরব বিপ্লব, যেখানে নেই কোনও প্রচার, নেই কোনও চাওয়া-পাওয়া। শুধুই একটি দায়বদ্ধতা, এক বুক ভালোবাসা ও অফুরন্ত মানবতা।

সমাজে হাজারো মানুষের ভিড়ে মনছুর আহমেদরা হয়ে থাকেন নিঃশব্দ নায়ক, যাদের কাজ আমাদের শিখিয়ে দেয়—ভালোবাসা আর সেবারও আছে এক অবিনাশী জীবন, যা লিখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়, হয়তো অঘোষিত, কিন্তু চিরন্তন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ