সিলেট ২৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৫ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
প্রকাশিত: ৫:১১ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০২৫
নিজস্ব প্রতিবেদক : মাচার ফাঁকে ঝুলছে সারি সারি সবুজ করলা। কুয়াশাভেজা সকালের রোদে ঝকমক করছে প্রতিটি করলার গায়ে জমে থাকা শিশিরবিন্দু। গাছে গাছে সবুজের ছড়াছড়ি। দৃশ্যটা দেখলে মনে হবে, আপনি কোনো সবজির রাজ্যে এসে পড়েছেন।
এটা স্বপ্ন নয়—এটাই বাস্তব। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের একটি ছোট্ট গ্রাম পাড়ের টং—যেটিকে এখন সবাই চেনে ‘করলা গ্রাম’ নামে।
এই গ্রামের প্রায় শতভাগ পরিবার কোনো না কোনোভাবে করলা চাষের সঙ্গে যুক্ত। জমি হোক কিংবা বাড়ির উঠোন—যেখানে সামান্য জায়গা, সেখানেই চাষ হচ্ছে করলা। এমনকি কেউ কেউ বাড়ির ছাদেও ঝুলন্ত মাচা তৈরি করে করলা ফলাচ্ছেন।
গ্রামের প্রবীণ কৃষক থেকে শুরু করে তরুণরাও এখন করলা চাষে আগ্রহী। নারীরাও পিছিয়ে নেই। সেচ, সার, পরিচর্যা—সব কিছুতেই নারীরা পাশে থাকছেন পুরুষদের।
এই গ্রামে মূলত চাষ হয় লাল তীর সীড লিমিটেডের হাইব্রিড জাত ‘টিয়া সুপার’ করলা। মাত্র ৪০-৪৫ দিনের মধ্যেই এই জাতের করলা বাজারজাত করা যায়। সময় কম লাগে, ফলন বেশি হয়—এটাই এই জাতের বড় শক্তি। এর ফলন ভালো, ওজনও বেশি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলক ভালো।
কৃষক ওয়াসিম মিয়া বলেন, “সিজন অনুযায়ী টিয়া সুপারের করলা চাষ করে আমরা লাভবান হয়েছি। এটা শুধু আমার জন্য না—পুরো গ্রামের জন্যই আশীর্বাদ। প্রতি বছর আমি প্রায় ১০-১২ লাখ টাকার করলা বিক্রি করি। এখন গ্রামের অনেক বেকার যুবকও করলা চাষে নেমেছে।”
আরেক করলা চাষি বেলাল মিয়া বলেন, “প্রায় ১০ বছর ধরে করলা চাষ করছি। এই জাতের করলা থেকে কখনোই লোকসান হয়নি। কিছু ফসল বিক্রি করেছি, কিছু এখনও মাচায় আছে। বাজারে ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।”
করলা চাষের মৌসুমে এই গ্রামে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা আসেন করলা কিনতে।
হবিগঞ্জের পাইকার মো. রহিম মিয়া বলেন, “ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ অনেক জায়গায় এখানকার করলা সরবরাহ করি। গত বছরের চেয়ে এবার ফলনও ভালো, বাজারদরও ভালো। আশা করছি অন্তত ৮-১০ লাখ টাকার করলা এখান থেকে কিনতে পারবো।”
এই গ্রামের আরেক বিশেষত্ব হলো—এখানে বিষমুক্ত বা অল্প কীটনাশকে করলা চাষের প্রবণতা বেশি। অধিকাংশ কৃষকই জৈব সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করেন। এতে করে করলার গুণগতমান যেমন ভালো থাকে, তেমনি ভোক্তারও আস্থা তৈরি হয়েছে এই গ্রামের করলার প্রতি।
লাল তীর সীড লিমিটেডের ডিভিশনাল ম্যানেজার তাপস চক্রবর্তী বলেন, “এলাকাটি কৃষিপ্রধান। এখানকার কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের হাইব্রিড করলা চাষ করছেন। ফলন ভালো, রোগ কম হয়, তাই চাষিরাও খুশি। পাইকারদেরও আগ্রহ রয়েছে, কারণ এই করলার মান খুবই ভালো।”
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, “এই বছর উপজেলায় প্রায় ৩০০ বিঘা জমিতে করলা চাষ হয়েছে। এতে প্রায় ২ থেকে আড়াই কোটি টাকার করলা উৎপাদন ও বিক্রি সম্ভব। করলা চাষ লাভজনক হওয়ায় অন্যান্য গ্রামেও আগ্রহ বাড়ছে।”
তিনি আরও জানান, কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে, যাতে কৃষকেরা আরও বিজ্ঞানসম্মতভাবে চাষ করতে পারেন।
পাড়ের টং গ্রামে করলা শুধু একটি ফসল নয়—এটি এখন জীবন ও জীবিকার উৎস। এই ফসল বদলে দিয়েছে গ্রামের অর্থনীতি, বদলে দিয়েছে পরিচয়। এখন এই গ্রাম পরিচিত দেশের নানা প্রান্তে একটি উদাহরণ হিসেবে।
গ্রামের স্কুলছাত্রীরাও জানে করলার জাত, ফলনের সময়। নারীরাও জানে মাচা বানানো, সেচ দেয়া, সার প্রয়োগের সঠিক নিয়ম। এটি শুধু কৃষি নয়—একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক রূপান্তর।
‘পাড়ের টং’ শুধু একটি গ্রামের নাম নয়, এখন এটি একটি পরিচয়, একটি সম্ভাবনার প্রতীক। করলা এখন শুধু একটি সবজি নয়—এটি একটি জীবিকা, একটি সংগ্রামের ফল, এবং একটি সবুজ বিপ্লবের গল্প।
সম্পাদক : সাদিকুর রহমান সাকী
Design and developed by EBN-HOST-BD