ভোলাগঞ্জে ‘সাদা পাথর’ আজ হুমকির মুখে: চোখের সামনে প্রাকৃতিক ধ্বংসযজ্ঞ

প্রকাশিত: ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ, মে ২০, ২০২৫

ভোলাগঞ্জে ‘সাদা পাথর’ আজ হুমকির মুখে: চোখের সামনে প্রাকৃতিক ধ্বংসযজ্ঞ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা ভোলাগঞ্জ। এখানকার ‘সাদা পাথর’ অঞ্চল শুধু সিলেটের নয়, গোটা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। পাহাড়ি ঝরনার স্রোতের মাঝে ছড়িয়ে থাকা শুভ্র পাথর আর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা এই জায়গাটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গভূমি। তবে, এই নান্দনিক ভোলাগঞ্জ আজ আর কেবল প্রকৃতির টানে আগত পর্যটকদের স্বর্গভূমি নয়—এখন তা হয়ে উঠেছে লুটেরাদের খেলার মাঠ।

সম্প্রতি (২০ মে, বুধবার) ভোর থেকে আবারও শুরু হয়েছে প্রকাশ্য পাথর লুট। স্থানীয় ভাষায় যাদের ‘পাথরখেকো’ বলা হয়, তারা শত শত নৌকা ও ট্রলারে করে পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে থাকা পাথর তুলছে অবাধে। এই ঘটনাগুলো ধরা পড়েছে স্থানীয়দের মোবাইল ক্যামেরায়। অনেকেই ফেসবুকে লাইভে এসে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। ভিডিওগুলো ভাইরাল হওয়ার পর নেট দুনিয়ায় শুরু হয় ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ।

প্রশাসনের ভূমিকা: দেখেও না দেখার ভান?

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ফুটেজে দেখা গেছে, ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল, কিন্তু তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নিষ্ক্রিয়। পাথর উত্তোলনকারীদের নির্লিপ্তভাবে কাজ করতে দেখা গেছে প্রশাসনের সামনে দিয়েই। এ থেকেই অনেকের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—পাহাড়ি ঢলের মৌসুমে যখন এমন লুটপাট নিয়মিত ঘটে, তখন কেন তা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না?

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের একাংশের সঙ্গে যোগসাজশেই চলছে এই সংঘবদ্ধ লুটপাট। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী চক্রের মদদেই এই অপতৎপরতা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতির অবনতি

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, গত বছরের সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ভোলাগঞ্জে পাথর উত্তোলনের মাত্রা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং অস্ত্রধারী দাপট। প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল ও সংঘবদ্ধ চক্র এখানে নিজের আধিপত্য কায়েম করেছে বলেই মনে করছেন এলাকাবাসী।

একজন স্থানীয় তরুণ সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “ভোলাগঞ্জ এখন আর আগের মতো নয়। একসময় যেখানে সাদা পাথরের সৌন্দর্যে মোহিত হতেন সবাই, এখন সেখানে দেখা যায় দলে দলে পাথরখেকোদের। প্রশাসন চাইলেই এই অপতৎপরতা বন্ধ করতে পারে, কিন্তু তারা চুপ করে বসে থাকে। কেন?”

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পর্যটন সম্ভাবনা

ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত বিশেষ। প্রায় ১৫ একরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাদা পাথর, স্বচ্ছ পানি, এবং ঝরনার মত বয়ে যাওয়া স্রোতধারা এ জায়গাটিকে পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় এক ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। প্রতিবছর হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক ভোলাগঞ্জে আসেন এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে। এখানকার পর্যটন খাতে সঠিক বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ হলে তা সিলেটের অর্থনীতির জন্য একটি বড় উৎস হতে পারত।

কিন্তু লাগাতার পাথর উত্তোলন, যান্ত্রিক ট্রলি ও নৌকার শব্দ এবং পানি দূষণের কারণে এখানকার জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এইভাবে চলতে থাকলে কিছু বছরের মধ্যেই ‘সাদা পাথর’ থাকবে শুধুই ইতিহাসে।

প্রতিরোধে টাস্কফোর্স: আশার আলো না লোক দেখানো?

বিজিবি ৪৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্ণেল নাজমুল হক জানিয়েছেন, পাথর লুট ঠেকাতে ইতোমধ্যে টাস্কফোর্সের অভিযান শুরু হয়েছে। তিনি বলেছেন, “যেকোনো মূল্যে পাথর লুট বন্ধ করা হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”

তবে, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অনেকে আশঙ্কা করছেন, এই টাস্কফোর্সের কার্যক্রমও কেবল কিছুদিনের জন্য লোক দেখানো হতে পারে। কারণ, আগে এমন অভিযান শুরু হলেও কিছুদিন পরেই তা স্তিমিত হয়ে যায় এবং আগের মতোই লুটপাট চলতে থাকে।

জনগণের দাবি: স্থায়ী ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি

স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী এবং পর্যটনকর্মীরা বলছেন, এখন সময় এসেছে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার। সাদা পাথরের পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষা করতে হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে কঠিনভাবে—কেবল অভিযানের মাধ্যমে নয়, বরং নিয়মিত তদারকি, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যটন এলাকা হিসেবে উন্নয়ন এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে।

একজন প্রবীণ শিক্ষক বলেন, “এই এলাকা আমাদের সম্পদ। সাদা পাথর শুধু পাথর নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের পর্যটন, আমাদের ভবিষ্যৎ। আমরা চাই না এটি কিছু দুর্বৃত্তের লোভে নষ্ট হোক।”

ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর কেবল একটি পর্যটন স্পট নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। সরকারের উচিত এই অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। অবিলম্বে লুটপাট বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে তা শুধু প্রকৃতিকে ধ্বংস করবে না, দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এখনই সময়, প্রকৃতির পাশে দাঁড়াবার। এখনই সময়, ভোলাগঞ্জকে রক্ষা করার।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ