সিলেট ৩০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
প্রকাশিত: ৬:০৮ অপরাহ্ণ, মে ১১, ২০২৫
সুবর্ণা হামিদ
ভোর হওয়ার ঠিক আগে, যখন সারা পৃথিবী ধীরে ধীরে জেগে ওঠে, তখন পাহাড়ি চা-বাগানগুলোয় শুরু হয় অন্যরকম এক ব্যস্ততা। শিশিরে ভেজা পাতা, কুয়াশায় মোড়া গাছের সারি আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নরম রোদে সোনালি পাহাড় — সবকিছুর মধ্যে একটা অপরূপ সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই ছড়িয়ে থাকে অনেক অনুচ্চারিত কষ্ট, অব্যক্ত জীবনসংগ্রাম। চায়ের পাতার ভেতর লুকিয়ে থাকে হাজারো মুখ—যাদের অধিকাংশই নামহীন, কাগজে-কলমে নেই কোনো অস্তিত্ব। তেমনই একজন, তানজিনা বেগম। একজন মা, একজন শ্রমজীবী নারী, যিনি প্রতিটি সকাল শুরু করেন একমুঠো স্বপ্ন আর বুকভরা ত্যাগ নিয়ে।
তানজিনার দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার অনেক আগে। সিলেটের এক চা-বাগানের কোলে তার আধাবসা ঘর। সিমেন্ট না-দেয়া মেঝেতে এক কোনে রাখা চুলায় ফুটে উঠে ভাত আর ডালের গন্ধ। এই গন্ধ তার জীবনের প্রতিদিনকার সঙ্গী, যেমন সঙ্গী তার উদ্বেগ আর অপূর্ণতা। তিনি রান্না করেন সামান্য চাল-ডাল, সন্তানদের জন্য একটুখানি আলুভর্তা। জানেন, তাতে পেট ভরে না, কিন্তু তিনি তবু ভালোবাসার হাতেই দেন খাবার। একজন মা হিসেবে এটাই তার প্রতিদিনকার নিবেদন।
তানজিনার বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। কিন্তু তার চোখে-মুখে সময়ের ক্লান্তি, চুলে হালকা সাদা রেখা, হাতে পায়ের শিরাগুলো যেন বলে দেয় শত পরিশ্রমের কথা। প্রতিদিন ভোরে তিনি হাঁটেন বাগানের পাতা তুলে। কাঁধে ঝুড়ি, হাতে কাঁচি। গাছে গাছে ঘুরে ঘুরে কেটে চলেন পাতা, কিন্তু তার চোখে কোনো সবুজ নেই। তাতে ভেসে ওঠে শুধুই রঙহীন এক যাত্রা—না-পাওয়ার যন্ত্রণা আর ভবিষ্যতের চিন্তা।
তানজিনা দুই সন্তানের জননী। বড় ছেলে তানভীর ইসলাম সিলেট সরকারি কলেজে ডিগ্রি ১ম বর্ষের ছাত্র। ছোট মেয়ে বিথি আক্তার সাহেবের বাজার স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ে, দশম শ্রেণিতে। একজন চা শ্রমিক মায়ের পক্ষে এই শিক্ষার খরচ বহন করা সহজ নয়। তারপরও, তানজিনা চান তার সন্তানরা এমন এক জীবন পাক, যা শুরু হবে না আধা পেট খেয়ে, অথবা ঝুড়ি হাতে পাহাড়ি পথে হেঁটে।
তিনি চান না, তানভীর বা বিথি আরেকজন ‘চা শ্রমিক সন্তান’ হয়ে বাঁচুক—তারা যেন হয়ে ওঠে আলোর দূত, হোক শিক্ষিত, হোক সম্মানিত। তিনি চান, তারা যেন ডাক্তার হয়—তারা যেন সেই শ্রেণির প্রতিনিধি হয়, যারা চা শ্রমিক মায়েদের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারবে। এই স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা।
তানজিনা বলেন,
“আমি জানি না ওরা ডাক্তার হতে পারবে কি না। কিন্তু আমি জানি, ওদের জন্য আমি সব করতে পারি। পেছনে তাকানোর সময় নাই।”
প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙার পর থেকেই শুরু হয় যুদ্ধ। একদিকে সন্তানের স্কুল-কলেজের ফি, বই-খাতা, খাবার—অন্যদিকে নিজের শরীরের ক্লান্তি, বয়সের ভার। চা বাগানে কাজ করে দিনে একশো-দেড়শো টাকা রোজগার করেন তিনি। এই আয় দিয়ে সংসার চালানো তো দূরের কথা, বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ চালানো এক অসম লড়াই।
কখনো তিনি দুপুর না খেয়ে থাকেন, কখনো বিকেল বেলা শুধু চা খেয়ে দিন পার করেন। সন্তানদের মুখে যেন খাবার থাকে, তারা যেন ক্লাসে না-খেয়ে না যায়—এই তার প্রধান চিন্তা।
তার এক প্রতিবেশী বললেন,
“তানজিনা এত কষ্ট করে, তবুও মুখে কখনো আফসোস করে না। শুধু বলে, ওদের ভবিষ্যৎ যেন আমার মতো না হয়।”
বাংলাদেশের চা শ্রমিক সম্প্রদায় এক বিশেষ বৈষম্যের ভেতর দিয়ে চলে আসছে শত বছর ধরে। এই জনগোষ্ঠীকে প্রায়শই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষা করা হয়। তারা থাকে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে, শিক্ষা-চিকিৎসা-স্বাস্থ্যসেবায় তাদের অধিকার প্রায় অনুপস্থিত। অথচ তাদের হাতেই প্রতিদিন তৈরি হয় দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য—চা।
তানজিনা বেগমদের মতো মায়েরা সেই সিস্টেমের নিঃশব্দ অংশীদার। তারা শুধু চা পাতা সংগ্রহ করেন না, তারা জাতির ভিতও গড়ে দেন। তবু তাদের জন্য নেই আলাদা সরকারি পরিকল্পনা, নেই বিশেষ শিক্ষা তহবিল, কিংবা স্বাস্থ্যবিমা।
এই বৈষম্যের বাস্তবতা প্রসঙ্গে স্থানীয় এক সমাজকর্মী বলেন,
“চা শ্রমিকদের জীবন উন্নয়নে আমরা যেটুকু করি, সেটা খুবই সামান্য। সরকারের উচিত এই শ্রমিকদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা, যেন তানজিনাদের মতো মায়েরা একটু স্বস্তি পান।”
তানজিনা বেগম জানেন না আগামীকাল কী হবে। তিনি জানেন না, তার সন্তানেরা ডাক্তার হতে পারবে কি না, কিংবা আগামী মাসে কলেজের বেতন দিতে পারবেন কি না। কিন্তু তিনি জানেন, থেমে গেলে চলবে না। প্রতিদিন একটি একটি করে পাতা কেটে তিনি নিজের স্বপ্ন সেলাই করে চলেছেন।
তানভীর যখন রাতে পড়াশোনা করে, আর বিথি আঁকছে মানুষের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, তখন তানজিনার মনে হয়—এইতো, স্বপ্ন খুব দূরে নয়। হয়তো এই জীবন তাকে সব দেয়নি, কিন্তু সে চেষ্টা করছে তার সন্তানদের সবটুকু দেওয়ার।
একবার তিনি বলেছিলেন,
“আমি চাই না আমার ছেলেমেয়ে বাগানে কাজ করুক। আমি চাই, ওরা যেন আমাদের মতো মানুষদের পাশে দাঁড়ায়। এটা আমার স্বপ্ন না, এটা আমার অধিকার।”
তানজিনা বেগম একজন প্রতীক—সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা হাজারো মায়ের প্রতিনিধি। তাদের কণ্ঠস্বর হয়তো শহরের কোলাহলে হারিয়ে যায়, কিন্তু তাদের কষ্ট, ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের গল্প হারায় না কখনো। তারা জানে না কীভাবে নীতিনির্ধারকদের কাছে দাবি তুলতে হয়, তারা শুধু জানে কীভাবে সন্তানকে বুকভরা স্বপ্ন দিয়ে বড় করতে হয়।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে যখন আমরা গল্প করি, বিশ্রাম নিই, তখন হয়তো আমাদের খেয়াল থাকে না—এই পাতাগুলো তুলে আনতে কেউ প্রতিদিন ভোরে ওঠে, খালি পেটে, কষ্ট নিয়ে, তবু মুখে একরাশ ভালোবাসা নিয়ে।
সেই ভালোবাসা আর স্বপ্নের নাম তানজিনা বেগম।
সম্পাদক : সাদিকুর রহমান সাকী
Design and developed by EBN-HOST-BD