সিলেট ১লা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৮ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
প্রকাশিত: ৫:৫৭ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০২৫
নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট শহরের অলিগলি কিংবা প্রত্যন্ত পাড়া-মহল্লায় এখন এক নতুন আতঙ্ক—কোথায় গেলো ছেলেটা? কোথায় পালালো মেয়েটা? বাস্তবে তারা পালায় না, বরং প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে হারিয়ে যায় অন্ধকার কোনো গন্তব্যে, যেখান থেকে ফিরে আসা মানে মানসিক, শারীরিক এবং সামাজিকভাবে ক্ষত-বিক্ষত হওয়া।
গত কয়েক মাসে সিলেট মহানগরের ছয়টি থানায় নিখোঁজের ৯৪টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে, যার মধ্যে ৬৭ জন উদ্ধার হলেও বাকিদের কোনো হদিস নেই। পরিবারের অজান্তে, কখনো বন্ধুর মাধ্যমে, আবার কখনো ‘চাকরি’ বা ‘বিদেশ যাত্রার’ নামে দালালদের হাত ধরে পাড়ি দেয় অজানায়।
সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে উদ্ধার হওয়া দুই কিশোরীর কাহিনি যেন এই অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি। সিলেটের শাহপরান এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া মেয়েদের প্রথমে চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়, পরে তারা পৌঁছে যায় কক্সবাজারের একটি হোটেলে। সেখানে তাদের চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়।
ঘটনার নেপথ্যে ছিল শাহপরান এলাকার শাহনাজ বেগম ও তার স্বামী মুরাদ আহমেদ রাজু। তাদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেন এক কিশোরীর মা।
এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে তারা রিমান্ডে রয়েছেন। সিলেট মহানগর হাকিম ছগির আহমদ তাদের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এই ঘটনাটি আলোচনায় এলেও, এমন আরও অনেক ঘটনার কোনো সন্ধানই পৌঁছায় না পুলিশের কাছে। অনেক সময় পরিবারেরাও মানসম্মানের ভয়ে মুখ বন্ধ রাখে।
একই রকমভাবে জকিগঞ্জ উপজেলার পাঁচ যুবক পাচারের শিকার হতে চলেছিল। তাদের বলা হয়েছিল—‘বিদেশে রাজমিস্ত্রির কাজ’, কিন্তু বাস্তবে কক্সবাজারের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তাদের। পুলিশ মাঝপথে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করে তাদের।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, “পাচারকারী চক্রগুলোর রুট, নেটওয়ার্ক ও মূলহোতাদের খুঁজে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।”
তবে শুধু পুলিশি অভিযানই যথেষ্ট নয়। সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান বলেন, “পরিবারের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি চাকরির বা বিদেশ যাওয়ার নামে কাউকে বাইরে পাঠায়, বিষয়টি নিকটস্থ থানায় জানানো উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের ওপর নজর রাখা এবং তাদের সচেতন করা দরকার, যেন তারা অপরিচিত কারো ফাঁদে না পড়ে।”
মানবপাচারকারীদের অন্যতম লক্ষ্য এখন বিত্তহীন পরিবারের ছেলে-মেয়েরা। পরিবারে অভাব, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও চাকরির আকাঙ্ক্ষা—এই তিনকে অস্ত্র বানিয়ে দালালেরা টার্গেট করে করছে তরুণদের।
তাদের বলা হয়, “ঢাকায় কাজ আছে,” “কারখানায় চাকরি দিবো,” “ভালো বিদেশে পাঠাবো”—এমন সব প্রলোভন। বাস্তবে তারা যায় হয় পতিতাবৃত্তিতে, নয়তো শ্রমিক হিসেবে দুঃসহ পরিবেশে আটক হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় সচেতনতা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে নজরদারি এবং স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ক্যাম্পেইন চালানো। স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
পাশাপাশি দরকার দালালদের ধরিয়ে দিতে সাহসী হওয়ার—যেন আর কোনো শিশু হারিয়ে না যায়, আর কোনো মা সন্তানের অপেক্ষায় পাথর না হয়ে যায়।
তারা শুধু নিখোঁজ নয়—তারা হারিয়ে ফেলে তাদের শৈশব, তাদের স্বপ্ন। ফিরে আসলেও আর ফিরে আসে না সেই সরল মুখগুলো।
সিলেটের এই ঘটনা দেশের জন্য এক সতর্কবার্তা—মানবপাচার এখন আর শুধু আন্তর্জাতিক সীমানা পার হওয়ার গল্প নয়, এটা এখন ঘর থেকেই শুরু হওয়া ভয়ানক এক মানবিক বিপর্যয়।
সম্পাদক : সাদিকুর রহমান সাকী
Design and developed by EBN-HOST-BD