সিলেট ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
প্রকাশিত: ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ, জুন ২২, ২০২৫
সুবর্ণা হামিদ : সিলেটের জৈন্তাপুরে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সম্পত্তির মালিকানা কেবল নারীদের হাতে থাকলেও, সময়ের পরিবর্তনে সেই প্রথা এখন প্রশ্নের মুখে। সম্প্রদায়ের পুরুষদের একটি অংশ এখন সম্পত্তির ওপর ন্যায্য অধিকার দাবি করে বলছে—সমতা ছাড়া সমাজের টিকে থাকা কঠিন।
খাসিয়া জনগোষ্ঠী, যারা দীর্ঘদিন ধরে মাতৃতান্ত্রিক সমাজপদ্ধতি অনুসরণ করে আসছে, সেখানে কনিষ্ঠ কন্যা হয়ে থাকেন পারিবারিক সম্পত্তির মূল উত্তরাধিকারী। এটি শুধুই একটি প্রথা নয়, বরং একধরনের সাংস্কৃতিক ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে খাসিয়া সমাজের সামাজিক কাঠামো। তবে এই ঐতিহ্যের মধ্যেও এখন ধীরে ধীরে পরিবর্তনের সুর শোনা যাচ্ছে। সম্প্রদায়ের অনেক শিক্ষিত ও সচেতন পুরুষ এখন সম্পত্তিতে আংশিক হলেও অধিকার দাবি করছেন।
জৈন্তাপুরের খাসিয়া সেবা সংঘ নিজপাট-এর সভাপতি সুরঞ্জিত রম্বাই বলেন,
“আমরা নারীদের অধিকার কেড়ে নিতে চাই না, বরং চাই—আমরাও যেন কিছুটা হলেও সম্পত্তিতে অংশ পাই। সমাজ বদলে গেছে, আমরা পিছিয়ে থাকতে চাই না।”
সহসভাপতি ফাইসাল খংলা আরও যোগ করেন,
“আগে পুরুষরা সরল-সহজ ছিলেন, দাবি জানাতেন না। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে আমাদেরও ন্যায্য অধিকার থাকা দরকার।”
তবে সম্পত্তির অধিকার শুধুই আর্থিক বিষয় নয়, বরং নারীদের মতে, এটি তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক। নারী বিষয়ক সম্পাদক সুপ্রিতি ডিখা বলেন,
“নারীরা এখনও নানা বৈষম্যের মুখোমুখি। তাই তাদের হাতে সম্পত্তি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে হ্যাঁ, পুরুষদের একেবারে বঞ্চিত না করে সমঝোতার ভিত্তিতে কিছুটা অংশ দেওয়া যেতে পারে।”
সমাজ কল্যাণ সম্পাদক নীলা নাইয়াং আরও জানান,
“এখন অনেক নারী স্বেচ্ছায় ভাইদের সম্পত্তির অংশ দেন। যদিও এটি বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এতে একধরনের সহমর্মিতা গড়ে উঠেছে।”
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ কাওছার আহমদ বলেন,
“সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সব নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদার অধিকারী। খাসিয়া সমাজে সম্পত্তির উত্তরাধিকার শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থাকলেও, যদি তা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে, তবে তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।”
ব্লাস্ট-এর সিলেট শাখার সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট সত্যজিৎ কুমার দাসের মতে,
“মাতৃতান্ত্রিক কাঠামোটি খাসিয়া সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলেও, আধুনিক সমাজে লিঙ্গ সমতার প্রশ্নে এটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সংবিধানের আলোকে এর আইনি বৈধতা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।”
সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, খাসিয়া সমাজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। যাতে নারী-পুরুষ উভয়ের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয় এবং একইসঙ্গে ঐতিহাসিক মাতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোও হারিয়ে না যায়।খাসিয়া সমাজে সম্পত্তি বণ্টনের বর্তমান রীতি নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা শুধুই একটি সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়—বরং এটি বৃহত্তর সমাজে লিঙ্গ-সমতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এবং আধুনিক আইনি কাঠামোর পারস্পরিক টানাপোড়েনের প্রতিচ্ছবি। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই সংযোগস্থলে প্রয়োজন সমঝোতা, সংলাপ এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচার।
সম্পাদক : সাদিকুর রহমান সাকী
Design and developed by EBN-HOST-BD